সংকট-পরবর্তী বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি: স্বস্তির সময়ে ভবিষ্যতের প্রস্তুতি
ড. মো. আনোয়ার হোসেন

X
সংগৃহীত ছবি
বিগত ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল সংঘাত এবং তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইনের অন্যতম প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হু হু করে বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। সে সময়ে আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোতে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক ছিল, যার প্রতিফলন আমরা অভ্যন্তরীণ বাজারের অস্থিরতা এবং ভোক্তাদের আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয়ের মাধ্যমে দেখেছি। তবে আশার কথা হলো, গত কয়েক মাসে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ অনেকটাই নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার একটি স্থিতিশীল ও সহনীয় পর্যায়ে ফিরে এসেছে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭৫ থেকে ৮০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা চার মাস আগের তুলনায় বেশ স্বস্তিদায়ক। একই সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমেছে এবং অর্থনীতিতে এক ধরনের সামষ্টিক স্বস্তি ফিরে এসেছে। ভূরাজনীতির এই শান্ত সময় আমাদের অলস বসে থাকার অবকাশ দেয় না। ইতিহাস প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক বাজারের এই স্থিতিশীলতা চিরস্থায়ী নয়। তাই বর্তমানের এই স্বস্তির সময়কে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের যেকোনো আকস্মিক ধাক্কা মোকাবিলার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, তথ্যনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
বিগত সংকটের গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাজারে প্রকৃত ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই কেবল ঘাটতি হতে পারে—এই মনস্তাত্ত্বিক আশঙ্কায় বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল। এটি ছিল মূলত একটি আচরণগত ও কাঠামোবদ্ধ সংকট। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, দেশের অভ্যন্তরে একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ী সরবরাহ লাইনে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে আতঙ্কজনিত ক্রয়ের প্রবণতা বাড়ায়, যা বাজারে চাহিদার ওপর কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হলেও সরকারকে বাজার তদারকি এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা জোরদার রাখতে হবে। জ্বালানির মজুদের প্রকৃত তথ্য নিয়মিত জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে যেকোনো সংকটে গুজব ছড়ানো রোধ করা সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখন সহনীয় পর্যায়ে থাকায় বাংলাদেশের সামনে কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ দিনের, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের অন্তত ৯০ দিনের কৌশলগত মজুদ থাকা অপরিহার্য। বর্তমানের এই কম মূল্যের বাজারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের উচিত দেশের স্টোরেজ ট্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পের মতো অবকাঠামোগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করে দ্রুত খালাস ও মজুদের ব্যবস্থা করা।
কৌশলগত মজুদের পাশাপাশি আমাদের আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের জ্বালানি আমদানির সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, ফলে ওই অঞ্চলে সামান্য উত্তেজনা তৈরি হলেই আমাদের পুরো অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়ে। বর্তমানের এই শান্ত পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত ভারত, রাশিয়া কিংবা আফ্রিকার বিকল্প বাজারগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি জোরদার করা, যাতে একটি অঞ্চলে সংকট তৈরি হলেও বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ সচল রাখা যায়। স্বল্পমেয়াদে কম মূল্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ও জ্বালানি তেল ক্রয় করে যেমন ডিপোগুলো পূর্ণ করা দরকার, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মোট বিদ্যুতের ৪০ শতাংশ ক্লিন এনার্জি বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি থেকে নিশ্চিত করার রোডম্যাপে হাঁটতে হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষার একটি সুক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দামের যে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সূত্র চালু করেছে, তা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সময়োপযোগী। যখন বিশ্ববাজারে দাম কমছে, তখন দেশের বাজারেও এর সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ কমছে, অন্যদিকে বাজারের ওপর আর্থিক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকছে। তবে এই বাজারভিত্তিক মূল্য কাঠামোর একটি সামাজিক পিঠও রয়েছে। জ্বালানির দাম কমলে পরিবহন ও কৃষি উৎপাদনে খরচ কমে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা রাখে। কিন্তু ভবিষ্যতে বিশ্ববাজার আবার উত্তপ্ত হলে যেন আকস্মিক মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, সেজন্য বর্তমানের এই সুসময়ে একটি ‘জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীলকরণ তহবিল’ গঠন করা যেতে পারে। এই তহবিল থেকে সংকটের সময়ে ভর্তুকি দিয়ে নিম্নআয়ের মানুষ এবং কৃষি খাতের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বা কার্ডের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে ডিজেল ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
পরিশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতাই আমাদের অর্থনীতির প্রধান দুর্বলতা। সাময়িক বৈশ্বিক স্বস্তি আমাদের এই দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের কথা যেন ভুলিয়ে না দেয়। এজন্য শিল্পকারখানাগুলোতে কো-জেনারেশন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে জ্বালানি দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, সাগরে ও স্থলভাগে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানের চলমান গতি বাড়াতে হবে এবং নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়াকে দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যেতে হবে। জ্বালানি security বা নিরাপত্তা কেবল কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বা অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের বিষয় নয়; এটি বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় একটি দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। ২০২৬ সালের শুরুর দিকের সেই উত্তাল ভূরাজনৈতিক সমুদ্র এখন শান্ত। কিন্তু বিচক্ষণ নাবিকের কাজ হলো শান্ত আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে জাহাজের মেরামত সম্পন্ন করা, যেন পরবর্তী ঝড়ে জাহাজটি নিরাপদে তীরে ফিরতে পারে। বাংলাদেশ অতীতেও বহুমাত্রিক বৈশ্বিক সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করে তার অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা প্রমাণ করেছে। বর্তমানের এই স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে একটি দূরদর্শী, সাহসী ও বহুমাত্রিক জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশ ভবিষ্যতের যেকোনো অর্থনৈতিক ঝড় সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারবে।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রকল্প পরিচালক, এলএসটিডি প্রকল্প
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)





