যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি হলেও ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি হলেও ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে

অবশেষে, অসংখ্য ব্যর্থ চেষ্টার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি শান্তিচুক্তিতে সম্মত হয়েছে। চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হবে আগামী শুক্রবার। স্বাভাবিকভাবেই উভয় পক্ষই বিজয় দাবি করছে। তবে ট্রাম্পের জন্মদিনের উপহার হিসেবে পাওয়া এই চুক্তি নিয়ে এখনও ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে, প্রশ্ন তোলার অবকাশও রয়েছে।

চুক্তি নিয়ে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের দেওয়া বক্তব্যেই অসামঞ্জস্য রয়েছে এবং যেহেতু পূর্ণাঙ্গ খসড়াটি এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তাই অনেক কিছুই আমাদের অজানা আছে। এই ভিন্ন ভিন্ন বিবরণগুলো আলোচনার পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানকে তুলে ধরে।

সই হতে যাওয়া চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য কতটা অর্থপূর্ণ এবং ব্যবধান কতখানি তা বিশ্লেষণ করেছে বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।

চুক্তিটির ঘোষণা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোববার (১৪ জুন) তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ তুলে নেবে।’

ট্রাম্প উচ্ছ্বসিত হয়ে আরও বলেন, ‘তেলের প্রবাহ শুরু হোক!’

তিনি আরও ঘোষণা করেন, অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ব্যর্থতার বিপরীতে, তিনি একটি ‘চমৎকার চুক্তি’ সম্পন্ন করেছেন যা ‘সমগ্র অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা’ বয়ে আনবে।

অবশ্যই, ট্রাম্পের জন্য এই ধরনের অতিরঞ্জিত কথাবার্তা নতুন কিছু নয়। গত বছর গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটানো চুক্তি সম্পর্কে তার ঘোষণাগুলো ছিল – ‘চিরস্থায়ী শান্তি’ এবং ‘বিশ্বাস, আশা ও ঈশ্বরের যুগের সূচনা’ যদিও বাস্তব পরিস্থিতি তার থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল।

বিবিসির মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরবিষয়ক সংবাদদাতা টম বেটম্যান বলেন, ‘এই চুক্তি হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েই ছিল।’

কারণ জ্বালানি তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ ক্রমেই বেড়ে চলছিল। এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রে গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছিল।’

অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক চাপে। এর সঙ্গে দেশটির বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ জোরদার হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল।

ফলে এ পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষেরই কিছুটা স্বস্তি দরকার ছিল।

এ চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হলো, গত ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ-পরিসর বাড়ানো। এর আওতায় আরও ৬০ দিন কোনো ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে না জড়ানোর অঙ্গীকার এখানে আছে।

বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবে। আর ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র।

একই সঙ্গে দুই পক্ষ আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে।

এদিকে, চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ বলেছেন, এই চুক্তিতে লেবাননসহ সকল রণাঙ্গনে সামরিক অভিযানের অবিলম্বে ও স্থায়ী সমাপ্তির কথাও বলা হয়েছে।

যদিও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান অভিযান শেষ করার প্রস্তুতির কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখাননি।

সুতরাং, এই চুক্তিটি লেবাননকে স্বস্তি দেবে কিনা তা স্পষ্ট নয়, যেখানে সাম্প্রতিক দুটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে ব্যর্থ হয়েছে।

এরইমধ্যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্পর্কে বলেও ফেলেছেন, ‘তিনি খুবই জটিল প্রকৃতির একজন মানুষ। তিনি ইরানের সঙ্গে চুক্তিটাকে প্রায় ভেস্তে দিয়েছিলেন’।

তবে ইরানের আরব উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের জন্য এটি একটি স্বস্তির বিষয় হবে যে, অন্তত আপাতত তাদের লক্ষ্য করে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির অবসান হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোনো চুক্তির সবচেয়ে অপরিহার্য উপাদানটির কথা বলতে গেলে বলতে হয়, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখা। এবং কার জন্য এই চুক্তিটি কতটা নিশ্চয়তা দেবে, তা আপাতত স্পষ্ট নয়।

যুদ্ধে যাওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলেছিল যে তারা এই ‘বিপদটিই’ মোকাবেলা করছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই চুক্তিতে এমন একটি ব্যবস্থা হয়তো স্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে এবং চুক্তি স্বাক্ষরের পর এটি সম্ভবত নিবিড় আলোচনার বিষয় হবে।

এই ধরনের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক চুক্তিতে সাফল্য বা ব্যর্থতা সাধারণত খুঁটিনাটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। আর এখানে, সেই খুঁটিনাটি বিষয়ের অভাব রয়েছে।

মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রোববার সন্ধ্যায় ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র না থাকার বিষয়টি এই চুক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ’।

তাই, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে এবং ইরানের কাছে বর্তমানে থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের কী হবে, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

যাই হোক, সেই ঐতিহাসিক চুক্তি সইয়ের অনুষ্ঠানটি হতে এখনও বেশ কয়েক দিন বাকি আছে। গত কয়েক সপ্তাহে এই প্রক্রিয়াটিতে যে সমস্ত নাটকীয় মোড় এসেছে, তাতে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারবে না যে সেই দিনটির দিকে যাওয়ার পথটি সহজ-সরল হবে।

তবে আপাতত, এই সংঘাত নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা—যা কয়েক সপ্তাহ ধরে যুদ্ধবিরতি ও সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে দোদুল্যমান ছিল তা অন্তত আংশিকভাবে হলেও দূর হয়েছে বলা চলে।

 

ঢাকা ইনফো ২৪ একটি বহুমুখী তথ্য বাতায়ন যেখানে আপনি পাবেন ব্রেকিং নিউজ, লাইফস্টাইল গাইড এবং ক্যারিয়ার বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সব আপডেট। আপনার প্রতিদিনের তথ্যের চাহিদা মেটাতে আমরা আছি আপনার পাশে।