বাংলাদেশের গ্রামের নারীদের জীবন, তাঁদের সামাজিক অবস্থান, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি। সেই গবেষণা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বই। তাঁর কাজ জায়গা করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে। তিনি নাইমা কায়ুম, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনভিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক।
নাইমা কায়ুমের গবেষণার কেন্দ্রে বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীরা। তাঁদের জীবনে দারিদ্র্য, সামাজিক রীতিনীতি ও স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্ক কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা অনুসন্ধান করেছেন তিনি। একই সঙ্গে দেখেছেন, গ্রামের নারীরা কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করে অধিকার আদায়, সরকারি সেবা পাওয়া এবং স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেন।
নাইমা কায়ুম দুই বছর ব্র্যাকে কাজ করেছেন। এ সময় তিনি পল্লি সমাজ কর্মসূচিসহ গ্রামীণ নারীদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর অনুসন্ধানে উঠে আসে, শুধু আইন প্রণয়ন বা নীতিমালা তৈরি করলেই নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় না। সমাজে প্রচলিত রীতিনীতি, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক এবং স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোও নারীদের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে।
গ্রামের নারীরা কীভাবে এসব বাধার সঙ্গে বোঝাপড়া করেন, নিজেদের সংগঠিত করেন এবং স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে দর-কষাকষি করেন, বইটিতে তার বিশ্লেষণ রয়েছে।
গবেষণাটিতে দেখানো হয়েছে, নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য তাঁদের সামাজিক বাস্তবতা বুঝে কাজ করা প্রয়োজন। বাইরে থেকে কোনো কর্মসূচি চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না; সেই কর্মসূচিকে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়।
নাইমা কায়ুমের পড়াশোনার শুরু যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের কোলগেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর সিটি কলেজ অব নিউইয়র্ক থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। পরে নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট সেন্টার থেকে এমফিল ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ২০১৪ সালে তাঁর পিএইচডি সম্পন্ন হয়।
পড়াশোনা শেষে তিনি গবেষণায় যুক্ত হন। বাংলাদেশে ব্র্যাকের পাশাপাশি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিতেও গবেষণার দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, জেন্ডার এবং উন্নয়ন।
২০১৫ সালে তিনি ম্যানহাটনভিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে সেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পাঠদান ও গবেষণা করছেন।
তুলনামূলক রাজনীতি, বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন এবং এশীয় অধ্যয়নের বিভিন্ন বিষয় পড়ান তিনি। বাংলাদেশের সমাজ ও উন্নয়ন নিয়ে তাঁর গবেষণার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়েও তাঁর আগ্রহ রয়েছে।
নাইমা কায়ুমের গবেষণার গুরুত্ব বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস কিংবা উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রমের পাশাপাশি গ্রামের নারীরা কীভাবে সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন, সেটিও উন্নয়ন বোঝার জন্য জরুরি। কোনো কর্মসূচি নারীদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে, তা বুঝতে তাঁদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও সামাজিক সম্পর্কের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
তাঁর গবেষণা বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক একাডেমিক আলোচনার অংশ করেছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন কর্মসূচি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় সমাজ, সামাজিক রীতিনীতি এবং নারীদের নিজস্ব উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ নিয়ে গবেষণা করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন নাইমা কায়ুম। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নারীদের জীবন, অধিকার ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে গবেষণা আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত হচ্ছে। দেশের সমাজকে বোঝার জন্য গবেষণা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তাঁর একাডেমিক কাজ তার একটি উদাহরণ।
সৌজন্য : পাবলিকিয়ান, ফেসবুক প্ল্যাটফর্ম
Source: Daily Bangladesh





