গাজীপুরের কাপাসিয়ার ঐতিহ্যবাহী ধাঁধার চরের ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চেয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছে সাননোভা এনার্জি ওপিসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা।
তিনি মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য এবং গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। প্রস্তাবিত জমিতে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মিলনস্থলের কাছে দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাণীগঞ্জ এলাকার ধাঁধার চরটি কাপাসিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। নদীর বুকের মধ্যে সবুজে ঘেরা এই চরে রয়েছে কৃষিজমি, গাছপালা, ঝোপঝাড় ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি-প্রাণীর আবাস। স্থানীয়দের কাছে চরটি সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা হিসেবেও পরিচিত।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ আগস্ট সাননোভা এনার্জির পক্ষে পরিচালক কামাল জামান মোল্লা জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। আবেদনে অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালার আওতায় বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত চাওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বৈদেশিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং কোরিয়া ও চীনের সঙ্গেও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে প্রস্তাবিত জমির বড় একটি অংশের শ্রেণি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ধাঁধার চর মৌজার ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমির মধ্যে নদী শ্রেণির জমি ৩০ দশমিক ৯৫ একর, বালুচর ১৩ দশমিক ৫৩ একর, সিকস্তি ৪৩ দশমিক ৬ একর এবং নাল শ্রেণির জমি ১৫২ দশমিক ৪৪ একর। অর্থাৎ মোট জমির প্রায় ৬৩ শতাংশই নাল শ্রেণির। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালায় খাস খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত জনগণের ব্যবহার্য নদী, খাল, নালা, ঘাটসহ বিভিন্ন শ্রেণির জমি বন্দোবস্তের আওতার বাইরে রাখার কথা উল্লেখ রয়েছে। ফলে ধাঁধার চরের জমিগুলোর প্রকৃত শ্রেণি ও বন্দোবস্তযোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাঁদের দাবি, নদীঘেরা এই চরকে বেসরকারি প্রকল্পের জন্য বন্দোবস্ত না দিয়ে পর্যটন ও প্রকৃতি সংরক্ষণকেন্দ্র হিসেবে উন্নয়ন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও গাজীপুরের পরিবেশকর্মী মনির হোসেন বলেন, ধাঁধার চরে ২৫ থেকে ৩০ প্রজাতির পাখি, বিভিন্ন সরীসৃপ, দেশীয় উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম রয়েছে। এখানে স্থানীয় কৃষকেরাও কৃষিকাজ করেন। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য চরটি বন্দোবস্ত দেওয়া হলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, চরটিকে প্রকৃতি ও নদী পর্যবেক্ষণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলমগীর বলেন, বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে বিপুল পরিমাণ জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রকল্পের আওতায় চলে যাবে। এতে চরের স্বাভাবিক পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। স্থানীয় কৃষক মো. সামছুল আলম বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই এখানে চর রয়েছে। তবে এটি ঠিক কত বছরের পুরোনো, তা আমরা জানি না।’ তাঁর দাবি, চরের কিছু পুরোনো গাছ সম্প্রতি কেটে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সাননোভা এনার্জির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা বলেন, ‘এই চরে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ১০০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি সেখানে রিসোর্ট টাইপের কিছু করারও পরিকল্পনা আছে। এখন সরকার যদি মনে করে দেওয়া যায়, তাহলে দেবে। নদীর জমি বা কৃষিজমি ইজারার জন্য আবেদন করিনি। যেসব খাসজমি পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে, সেগুলোর জন্য আবেদন করেছি।’
কাপাসিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক বলেন, ধাঁধার চর মৌজার এক নম্বর খাস খতিয়ানে ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমি রয়েছে। এসব জমির শ্রেণির মধ্যে নদী, সিকস্তি, নালা, ছনখোলা, বালুচর ও লায়েক পতিত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভুইয়া বলেন, ‘ধাঁধার চরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি ইজারা চেয়ে আমাদের কাছে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে জমিটি ইজারা দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এদিকে, গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. সালাহউদ্দিন আইয়ুবী গত ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ধাঁধার চরকে বিশেষ পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চরে কৃষকেরা চাষাবাদ করেন এবং সেখানে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলে গাছপালা কাটাসহ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
ফলে ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমির বন্দোবস্তের আবেদনটি এখন শুধু একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব নয়; জমির শ্রেণি, বন্দোবস্তের আইনগত সুযোগ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য এবং ধাঁধার চরের ভবিষ্যৎ ব্যবহার সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।





